ঢাকা ০৪:১৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
সাভারে দালালচক্র ও সাব-রেজিস্ট্রার রুবেল পারভেজের যোগসাজশে জমি নিবন্ধনে জালিয়াতির অভিযোগ শারদীয় দুর্গাপুজা উৎসব আমাদের জন্য অগ্নি পরীক্ষা: ডিএমপি কমিশনার ছিনতাইকারীদের কাছে বিক্রির জন্য রাখা ছিল ১০৫ সুইচ গিয়ার, গ্রেফতার ১ বাসে ওঠার সময় মোবাইল ছিনতাই, ট্রাফিক পুলিশের তৎপরতায় আটক ছিনতাইকারী বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও গুলিসহ গ্রেফতার দুই অস্ত্রধারী সাত মাসে সাড়ে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ: পুলিশ বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী: ছাত্রনেতার উদ্যোগে শতাধিক বৃক্ষরোপণ, শিক্ষার্থীরা পেল খেলার উপকরণ ঢাকায় ফের ৬ বছরের শিশু ধর্ষণ, যুবক গ্রেফতার রবীন্দ্র-নজরুল জন্মজয়ন্তীতে সাংস্কৃতিক আয়োজনে মুখর উৎকর্ষ প্রকল্পে অনিয়ম-প্রতারণা:/ ইউনিক গ্রুপের নূর আলী’র বিরুদ্ধে ১১৫ কোটি টাকা মানিলন্ডারিং মামলা

সাভারে দালালচক্র ও সাব-রেজিস্ট্রার রুবেল পারভেজের যোগসাজশে জমি নিবন্ধনে জালিয়াতির অভিযোগ

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক,
  • আপডেট সময় : ১০:০২:৪৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬ ১৬৪ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সরকারি বিধিবিধানের তোয়াক্কা না করে এবং নির্ধারিত উৎস কর ফাঁকি দিয়ে জমি নিবন্ধনের এক মহা-উৎসব চলছে ঢাকার সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে। সমিতি ও কোম্পানির নামে কেনাবেচা হওয়া জমিতে প্রযোজ্য উৎসে কর ব্যাপকভাবে কম দেখিয়ে দলিল সম্পাদন, মোটা অঙ্কের অনৈতিক অর্থ বা ঘুষের বিনিময়ে বিশেষ সুবিধা প্রদান এবং একটি প্রভাবশালী দালালচক্রের মাধ্যমে নিয়মবহির্ভূতভাবে কোটি কোটি টাকার জমি নিবন্ধনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সাভারের সাব-রেজিস্ট্রার মো. রুবেল পারভেজের বিরুদ্ধে।

শুধু তাই নয়, সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার এই অপকৌশলের পাশাপাশি রুবেল পারভেজের বিরুদ্ধে অবৈধ পন্থায় বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন এবং তা দিয়ে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলারও অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব জালিয়াতি ও সরকারি কোষাগারের টাকা ফাঁকির অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন সচেতন এক নাগরিক।

নিয়ম অনুযায়ী সরকারি কোষাগারে নির্ধারিত কর জমা না দিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট চক্রের স্বার্থ রক্ষায় সাভারের সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের আখড়ায় পরিণত করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে।

**সমিতি ও কোম্পানির জমিতে কর ছাঁটাইয়ের কৌশল**

আইন অনুযায়ী, কোনো নিবন্ধিত সমিতি, হাউজিং বা কোম্পানির জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত একটি সুনির্দিষ্ট হারের উৎস কর পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক। ব্যক্তি পর্যায়ের জমি কেনাবেচার রাজস্ব হারের চেয়ে সমিতি ও কোম্পানির ক্ষেত্রে এই হার বেশ ভিন্ন এবং রাজস্বের অঙ্কও বেশ বড়।

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা মো. হযরত আলী নামের এক ব্যক্তির লিখিত অভিযোগে জানা যায়, সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে এই বাধ্যবাধকতাকে পুরোপুরি নস্যাৎ করা হচ্ছে। সাব-রেজিস্ট্রার মো. রুবেল পারভেজের নেতৃত্বে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ সরকারি আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে সমিতি ও কোম্পানির জমি নিবন্ধনে সরকারের নির্ধারিত উচ্চ হারের উৎস কর এড়িয়ে কম কর দেখিয়ে দলিল সম্পাদন করছেন।

অভিযোগ সূত্রে প্রকাশ, সমিতি ও বাণিজ্যিক কোম্পানির জমির দলিলে যেখানে প্রযোজ্য কর আইনানুগভাবে শতভাগ জমা দেওয়ার কথা, সেখানে কৌশলে ও বেআইনিভাবে মাত্র ৫ শতাংশ উৎস কর দেখিয়ে জমি নিবন্ধন নিশ্চিত করা হচ্ছে। বাকি বিশাল পরিমাণের কর সরকারি কোষাগারে জমা না হয়ে অদৃশ্য উপায়ে অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে ভাগবাটোয়ারা হয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে সরকার প্রতি মাসে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আদায় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং এতে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অপূরণীয় ক্ষতি সাধন হচ্ছে।

**দালালচক্রের নিয়ন্ত্রণে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস**

সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সরকারি নিয়মনীতি বাস্তবায়নের চেয়ে দালালদের প্রভাবই যেন মূখ্য হয়ে উঠেছে। অভিযোগকারীর লিখিত নথিতে বলা হয়েছে, সাব-রেজিস্ট্রার রুবেল পারভেজের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগসাজশে শক্তিশালী একটি অনৈতিক দালালচক্র সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে।

এই সিন্ডিকেটের প্রধান কাজ হলো মোটা অঙ্কের ঘুষ ও অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে জমি কেনাবেচায় সরকারি কর কম দেখানোর পথ সহজ করে দেওয়া। চক্রটির মাধ্যমে সমিতি ও আবাসন প্রকল্পের জমি নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যক্তিমালিকানায় কিংবা বিশেষ ব্যক্তির নামে রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া, দলিলের তথ্য গোপন করা, জমির শ্রেণী পরিবর্তন দেখানো কিংবা সরকারি মূল্যায়ন কম দেখিয়ে দলিল রেজিস্ট্রি করার মতো জালিয়াতির ঘটনাও ঘটছে অহরহ।

লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, যে সকল পক্ষ দালালদের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট হারে কমিশন বা অনৈতিক সুবিধা প্রদান করে, তাদের সরকারি বিধির তোয়াক্কা না করেই দ্রুততম সময়ে দলিল সম্পাদন করে দেওয়া হয়। সাধারণ সেবাগ্রহীতারা যেখানে নিয়ম মেনে সেবা পেতে হয়রানির শিকার হন, সেখানে দালালদের মাধ্যমে যাওয়া বিশেষ দলিলসমূহ মুহূর্তের মধ্যেই সাব-রেজিস্ট্রার কর্তৃক পাস হয়ে যায়।

**দুই মাসেই অর্ধশত বিতর্কিত দলিল: যাচাইয়ের দাবি**

অভিযোগপত্র বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, কেবল গত জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসেই প্রায় অর্ধশত দলিল সম্পাদন করা হয়েছে, যেখানে প্রযোজ্য সরকারি করের চেয়ে বহু গুণ কম কর দেখিয়ে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করা হয়েছে। এসব দলিলের মাধ্যমে সমিতি ও বিভিন্ন কোম্পানির শত শত বিঘা জমির হাতবদল হলেও সরকার তা থেকে প্রাপ্য প্রকৃত রাজস্ব আয় থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়েছে।

অভিযোগকারী মো. হযরত আলীর দাবি, সরকারের রাজস্ব বিভাগের দুর্নীতি দমন শাখা কিংবা আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যদি শুধু গত জুলাই ও আগস্ট মাসে সম্পাদিত দলিলগুলো নিবিড়ভাবে যাচাই করা হয়, তবেই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। বিশেষ করে সম্পাদন করা দলিলের প্রকৃত জমির মূল্য, আইন অনুযায়ী ওই জমিতে প্রযোজ্য উৎস করের সঠিক হিসাব, দলিলে প্রকৃতপক্ষে প্রদর্শিত উৎস করের পরিমাণ এবং ব্যাংক চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া অর্থের হিসাব—এই চারটি সূচক সামঞ্জস্য রেখে পরীক্ষা করলে এই মহা-জালিয়াতির সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া সম্ভব।

সুশীল সমাজের মতে, যদি গত কয়েক মাসের এই চালানের নথি ও পে-অর্ডার অডিট করা হয়, তবে সরকারি কর ফাঁকি দেওয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট সবার ভূমিকা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

**অবৈধ সম্পদের পাহাড় ও আঙুল ফুলে কলাগাছ**

সাভার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ একটি এলাকা হওয়ায় এখানকার জমির মূল্য অনেক বেশি। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আইনবহির্ভূত কাজের মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রার মো. রুবেল পারভেজ বিপুল অর্থ উপার্জনে মেতে উঠেছেন বলে লিখিত অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।

অনৈতিক উপায়ে সরকারি রাজস্বের টাকা ব্যক্তিস্বার্থে ঘুরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে তিনি অবৈধভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। সরকারি চাকরির নির্দিষ্ট বেতন-ভাতার বাইরে গিয়ে সাভারে দায়িত্ব পালনকালীন সময়েই তিনি নিজেকে বেপরোয়া দুর্নীতিতে জড়িয়েছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

অভিযোগকারী এই বিশাল দুর্নীতি রোধ ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উদ্দেশ্যে অবিলম্বে বিতর্কিত সকল দলিল পুনঃযাচাই, চালানের অর্থ পরীক্ষা এবং সমিতি ও কোম্পানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিবন্ধন আইন হুবহু অনুসৃত হয়েছে কি না—তা নিরপেক্ষ কোনো সংস্থাকে দিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

**বক্তব্য জানতে গেলে সাব-রেজিস্ট্রারের ক্ষোভ ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ**

এসব গুরুতর ও নির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে সাভারের সাব-রেজিস্ট্রার মো. রুবেল পারভেজের কোনো বক্তব্য বা ব্যাখ্যা রয়েছে কি না, তা জানার চেষ্টা করে অনুসন্ধানী সংবাদ মাধ্যম। পেশাদার সাংবাদিকতার নীতি অনুসরণ করে সরেজমিনে সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যান এই প্রতিবেদক।

উত্থাপিত অভিযোগগুলোর কপি ও মূল তথ্য তুলে ধরে সাব-রেজিস্ট্রার মো. রুবেল পারভেজের কাছে লিখিত অভিযোগ ও রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে সরাসরি জানতে চাওয়া হয়। অভিযোগের সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর বা কোনো প্রকার ব্যাখ্যা দেওয়া থেকে বিরত থাকেন তিনি। উল্টো এই বিষয়ে প্রশ্ন করায় চরম উষ্মা ও অনীহা প্রকাশ করেন এই সরকারি কর্মকর্তা।

প্রশ্নের কোনো লিখিত বা মৌখিক উত্তর না দিয়ে সাব-রেজিস্ট্রার মো. রুবেল পারভেজ বেশ ঔদ্ধত্যের সুরে এই প্রতিবেদককে বলেন,”আমার কোনো বক্তব্য নেই, আপনার যা খুশি তাই লিখে দেন।”

পরবর্তীতে সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের এক কর্মচারী এসব অভিযোগকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন দাবি করে বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করতে প্রতিবেদককে ম্যানেজের চেষ্টা করে।

**নজরদারি ও তদন্তের দাবি সচেতন মহলের**

সাভার একটি শিল্পাঞ্চল ও আবাসন খাতের জন্য অত্যন্ত প্রাণকেন্দ্র হওয়ায় প্রতিদিন এখানে কোটি কোটি টাকার জমি কেনাবেচা হয়ে থাকে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একজন সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে সরকারি রাজস্ব চুরির অভিযোগ ওঠায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। সচেতন মহলের মতে, যদি সরকারি দপ্তরগুলোতে এইভাবে উৎস কর ফাঁকি দিয়ে দালালদের মাধ্যমে ফাইল ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দ্রুত সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের এসব বিতর্কিত দলিল ও চালান খতিয়ে দেখে অভিযুক্ত সাব-রেজিস্ট্রার মো. রুবেল পারভেজসহ জড়িত দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে—এমনটাই প্রত্যাশা ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিকদের।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

সাভারে দালালচক্র ও সাব-রেজিস্ট্রার রুবেল পারভেজের যোগসাজশে জমি নিবন্ধনে জালিয়াতির অভিযোগ

আপডেট সময় : ১০:০২:৪৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

সরকারি বিধিবিধানের তোয়াক্কা না করে এবং নির্ধারিত উৎস কর ফাঁকি দিয়ে জমি নিবন্ধনের এক মহা-উৎসব চলছে ঢাকার সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে। সমিতি ও কোম্পানির নামে কেনাবেচা হওয়া জমিতে প্রযোজ্য উৎসে কর ব্যাপকভাবে কম দেখিয়ে দলিল সম্পাদন, মোটা অঙ্কের অনৈতিক অর্থ বা ঘুষের বিনিময়ে বিশেষ সুবিধা প্রদান এবং একটি প্রভাবশালী দালালচক্রের মাধ্যমে নিয়মবহির্ভূতভাবে কোটি কোটি টাকার জমি নিবন্ধনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সাভারের সাব-রেজিস্ট্রার মো. রুবেল পারভেজের বিরুদ্ধে।

শুধু তাই নয়, সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার এই অপকৌশলের পাশাপাশি রুবেল পারভেজের বিরুদ্ধে অবৈধ পন্থায় বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন এবং তা দিয়ে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলারও অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব জালিয়াতি ও সরকারি কোষাগারের টাকা ফাঁকির অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন সচেতন এক নাগরিক।

নিয়ম অনুযায়ী সরকারি কোষাগারে নির্ধারিত কর জমা না দিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট চক্রের স্বার্থ রক্ষায় সাভারের সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের আখড়ায় পরিণত করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে।

**সমিতি ও কোম্পানির জমিতে কর ছাঁটাইয়ের কৌশল**

আইন অনুযায়ী, কোনো নিবন্ধিত সমিতি, হাউজিং বা কোম্পানির জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত একটি সুনির্দিষ্ট হারের উৎস কর পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক। ব্যক্তি পর্যায়ের জমি কেনাবেচার রাজস্ব হারের চেয়ে সমিতি ও কোম্পানির ক্ষেত্রে এই হার বেশ ভিন্ন এবং রাজস্বের অঙ্কও বেশ বড়।

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা মো. হযরত আলী নামের এক ব্যক্তির লিখিত অভিযোগে জানা যায়, সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে এই বাধ্যবাধকতাকে পুরোপুরি নস্যাৎ করা হচ্ছে। সাব-রেজিস্ট্রার মো. রুবেল পারভেজের নেতৃত্বে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ সরকারি আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে সমিতি ও কোম্পানির জমি নিবন্ধনে সরকারের নির্ধারিত উচ্চ হারের উৎস কর এড়িয়ে কম কর দেখিয়ে দলিল সম্পাদন করছেন।

অভিযোগ সূত্রে প্রকাশ, সমিতি ও বাণিজ্যিক কোম্পানির জমির দলিলে যেখানে প্রযোজ্য কর আইনানুগভাবে শতভাগ জমা দেওয়ার কথা, সেখানে কৌশলে ও বেআইনিভাবে মাত্র ৫ শতাংশ উৎস কর দেখিয়ে জমি নিবন্ধন নিশ্চিত করা হচ্ছে। বাকি বিশাল পরিমাণের কর সরকারি কোষাগারে জমা না হয়ে অদৃশ্য উপায়ে অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে ভাগবাটোয়ারা হয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে সরকার প্রতি মাসে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আদায় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং এতে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অপূরণীয় ক্ষতি সাধন হচ্ছে।

**দালালচক্রের নিয়ন্ত্রণে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস**

সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সরকারি নিয়মনীতি বাস্তবায়নের চেয়ে দালালদের প্রভাবই যেন মূখ্য হয়ে উঠেছে। অভিযোগকারীর লিখিত নথিতে বলা হয়েছে, সাব-রেজিস্ট্রার রুবেল পারভেজের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগসাজশে শক্তিশালী একটি অনৈতিক দালালচক্র সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে।

এই সিন্ডিকেটের প্রধান কাজ হলো মোটা অঙ্কের ঘুষ ও অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে জমি কেনাবেচায় সরকারি কর কম দেখানোর পথ সহজ করে দেওয়া। চক্রটির মাধ্যমে সমিতি ও আবাসন প্রকল্পের জমি নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যক্তিমালিকানায় কিংবা বিশেষ ব্যক্তির নামে রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া, দলিলের তথ্য গোপন করা, জমির শ্রেণী পরিবর্তন দেখানো কিংবা সরকারি মূল্যায়ন কম দেখিয়ে দলিল রেজিস্ট্রি করার মতো জালিয়াতির ঘটনাও ঘটছে অহরহ।

লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, যে সকল পক্ষ দালালদের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট হারে কমিশন বা অনৈতিক সুবিধা প্রদান করে, তাদের সরকারি বিধির তোয়াক্কা না করেই দ্রুততম সময়ে দলিল সম্পাদন করে দেওয়া হয়। সাধারণ সেবাগ্রহীতারা যেখানে নিয়ম মেনে সেবা পেতে হয়রানির শিকার হন, সেখানে দালালদের মাধ্যমে যাওয়া বিশেষ দলিলসমূহ মুহূর্তের মধ্যেই সাব-রেজিস্ট্রার কর্তৃক পাস হয়ে যায়।

**দুই মাসেই অর্ধশত বিতর্কিত দলিল: যাচাইয়ের দাবি**

অভিযোগপত্র বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, কেবল গত জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসেই প্রায় অর্ধশত দলিল সম্পাদন করা হয়েছে, যেখানে প্রযোজ্য সরকারি করের চেয়ে বহু গুণ কম কর দেখিয়ে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করা হয়েছে। এসব দলিলের মাধ্যমে সমিতি ও বিভিন্ন কোম্পানির শত শত বিঘা জমির হাতবদল হলেও সরকার তা থেকে প্রাপ্য প্রকৃত রাজস্ব আয় থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়েছে।

অভিযোগকারী মো. হযরত আলীর দাবি, সরকারের রাজস্ব বিভাগের দুর্নীতি দমন শাখা কিংবা আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যদি শুধু গত জুলাই ও আগস্ট মাসে সম্পাদিত দলিলগুলো নিবিড়ভাবে যাচাই করা হয়, তবেই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। বিশেষ করে সম্পাদন করা দলিলের প্রকৃত জমির মূল্য, আইন অনুযায়ী ওই জমিতে প্রযোজ্য উৎস করের সঠিক হিসাব, দলিলে প্রকৃতপক্ষে প্রদর্শিত উৎস করের পরিমাণ এবং ব্যাংক চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া অর্থের হিসাব—এই চারটি সূচক সামঞ্জস্য রেখে পরীক্ষা করলে এই মহা-জালিয়াতির সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া সম্ভব।

সুশীল সমাজের মতে, যদি গত কয়েক মাসের এই চালানের নথি ও পে-অর্ডার অডিট করা হয়, তবে সরকারি কর ফাঁকি দেওয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট সবার ভূমিকা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

**অবৈধ সম্পদের পাহাড় ও আঙুল ফুলে কলাগাছ**

সাভার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ একটি এলাকা হওয়ায় এখানকার জমির মূল্য অনেক বেশি। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আইনবহির্ভূত কাজের মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রার মো. রুবেল পারভেজ বিপুল অর্থ উপার্জনে মেতে উঠেছেন বলে লিখিত অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।

অনৈতিক উপায়ে সরকারি রাজস্বের টাকা ব্যক্তিস্বার্থে ঘুরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে তিনি অবৈধভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। সরকারি চাকরির নির্দিষ্ট বেতন-ভাতার বাইরে গিয়ে সাভারে দায়িত্ব পালনকালীন সময়েই তিনি নিজেকে বেপরোয়া দুর্নীতিতে জড়িয়েছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

অভিযোগকারী এই বিশাল দুর্নীতি রোধ ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উদ্দেশ্যে অবিলম্বে বিতর্কিত সকল দলিল পুনঃযাচাই, চালানের অর্থ পরীক্ষা এবং সমিতি ও কোম্পানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিবন্ধন আইন হুবহু অনুসৃত হয়েছে কি না—তা নিরপেক্ষ কোনো সংস্থাকে দিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

**বক্তব্য জানতে গেলে সাব-রেজিস্ট্রারের ক্ষোভ ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ**

এসব গুরুতর ও নির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে সাভারের সাব-রেজিস্ট্রার মো. রুবেল পারভেজের কোনো বক্তব্য বা ব্যাখ্যা রয়েছে কি না, তা জানার চেষ্টা করে অনুসন্ধানী সংবাদ মাধ্যম। পেশাদার সাংবাদিকতার নীতি অনুসরণ করে সরেজমিনে সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যান এই প্রতিবেদক।

উত্থাপিত অভিযোগগুলোর কপি ও মূল তথ্য তুলে ধরে সাব-রেজিস্ট্রার মো. রুবেল পারভেজের কাছে লিখিত অভিযোগ ও রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে সরাসরি জানতে চাওয়া হয়। অভিযোগের সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর বা কোনো প্রকার ব্যাখ্যা দেওয়া থেকে বিরত থাকেন তিনি। উল্টো এই বিষয়ে প্রশ্ন করায় চরম উষ্মা ও অনীহা প্রকাশ করেন এই সরকারি কর্মকর্তা।

প্রশ্নের কোনো লিখিত বা মৌখিক উত্তর না দিয়ে সাব-রেজিস্ট্রার মো. রুবেল পারভেজ বেশ ঔদ্ধত্যের সুরে এই প্রতিবেদককে বলেন,”আমার কোনো বক্তব্য নেই, আপনার যা খুশি তাই লিখে দেন।”

পরবর্তীতে সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের এক কর্মচারী এসব অভিযোগকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন দাবি করে বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করতে প্রতিবেদককে ম্যানেজের চেষ্টা করে।

**নজরদারি ও তদন্তের দাবি সচেতন মহলের**

সাভার একটি শিল্পাঞ্চল ও আবাসন খাতের জন্য অত্যন্ত প্রাণকেন্দ্র হওয়ায় প্রতিদিন এখানে কোটি কোটি টাকার জমি কেনাবেচা হয়ে থাকে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একজন সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে সরকারি রাজস্ব চুরির অভিযোগ ওঠায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। সচেতন মহলের মতে, যদি সরকারি দপ্তরগুলোতে এইভাবে উৎস কর ফাঁকি দিয়ে দালালদের মাধ্যমে ফাইল ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দ্রুত সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের এসব বিতর্কিত দলিল ও চালান খতিয়ে দেখে অভিযুক্ত সাব-রেজিস্ট্রার মো. রুবেল পারভেজসহ জড়িত দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে—এমনটাই প্রত্যাশা ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিকদের।